Home / ধর্ম / ক্বওমী শিক্ষকদের জীবন মান পরিবর্তন হবে কি? ইয়াসিন আমিন।

ক্বওমী শিক্ষকদের জীবন মান পরিবর্তন হবে কি? ইয়াসিন আমিন।

২০০২ সালে রাঙ্গুনিয়া খন্ডলিয়া পাড়া মাদরাসায় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্ম জীবন শুরু। আটারো শ’পঞ্চাশ টাকা বেতন। সত্তুরোর্ধ্ব পরিচালক মহোদয়ের বেতন বাইশ শ’। প্রায় দু’বছর এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলাম। কোনোদিন বাবার হাতে পাঁচশ’ টাকা তোলে দিয়েছি বলে মনে পড়েনা। যা পেতাম যাতায়াত, নাস্তা পানি, হাত খরচ, টুকিটাকিতে শেষ।


দু’ হাজার চার সালের দিকে জুমহুরিয়া মাদরাসায় যোগ দিলাম পঁচিশ শ’ টাকা বেতনে। নয় বছর পর যখন চলে আসছি তখন তা বেড়ে ছয় হাজারের কাছাকাছি। আমার সে সময়ের সহকর্মি যারা এখনো খেদমতে আছেন তাদের সর্বোচ্চ বেতন সাত আট হাজার।

ছয় সাত শ’ টাকায় চাকরি করতে দেখেছি আমাদের আসাতিজায়ে কেরামদের। যার আবার অধিকাংশ বাকি। এখনো ক্বওমী শিক্ষকদের গড় বেতন ছয় সাত হাজারের বেশি নয়।
কি হয় এই অংকের টাকায়? এক বস্তা চালের দাম যখন তিন হাজার টাকা, তখন সাত হাজারে একটা সংসার কিভাবে চলে? ভাবতে অবাক লাগে!

হুজুররা আনলিমিটেড বাচ্চা কাচ্চা নেয়ার শরয়ী হুকুমে অভ্যস্ত। চার পাঁচ সন্তানের ভরন পোষণ,মা বাবা,স্ত্রি, ভাই বোনের দেখভাল এই অল্প বেতনে কি করে সম্ভব তা ভাবার সময় কারো আছে কি?

অনেকে বলেন হুজুরদের টাকায় বরকত আছে। কতো ভালো চলেন হুজুররা!!
হ্যাঁ হুজুররা কতো ভালো চলেন তা তো দেখেছি। আমার এক সহ কর্মির ছেলের ছোট্ট একটা অপারেশনে মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার জন্য মানুষের ধারে ধারে ঘুরতে দেখেছি।দেখেছি পঞ্চাশ বছর শিক্ষকতার পর সামান্য চিকিৎসা খরচের জন্য চাঁদা কালেক্ট করতে। দশ বছর চাকরি করে বিয়ের খরচ যোগাড় করতে না পেরে যৌতুক নিয়ে বিয়ে করতে। তবে এটা ঠিক, শত অভাবের মাঝেও হাঁসি মুখে, পরিচ্ছন্ন বদনে সবার মাঝে বিচরনের এক অদ্ভুৎ যোগ্যতা আছে ক্বওমী ওলামায়ে কেরামদের। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর, অসম্ভব করুণ।যা সহজে প্রকাশ করেনা।

মাদরাসায় উঁচু উঁচু ইমারত তৈরিতে টাকার অভাব হয়না। সব অভাব শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিতে। বেতন বাড়ানোর সময় কতৃপক্ষের উজ্বল চেহরা মলিন হয়ে যায়। অথচ সবার আগে শিক্ষকদের জীবন মান, থাকা -খাওয়ার সুন্দর বন্দোবস্ত করা উচিৎ ছিলো। অথচ মাদরাসা গুলোতে সবচেয়ে অবহেলিত বিষয় শিক্ষকদের অধিকার।

শিক্ষকদের বেতনের এক আজগুবি নাম দেয়া হয়েছে হাদিয়া!! তার মানে এটা নিয়ে যেনো কেউ জোর খাটাতে না পারে! কিন্তু যখন কোনো শিক্ষক দু’ দিন অনুপস্থিত থাকেন তখন তার দুই দিনের মাইনে কাটার ব্যাপারে এটা বেতন হয়ে যায়।তখন আর হাদিয়া থাকেনা। সুতরাং এটা বেতনই, হাদিয়া নয়।এটা তার প্রাপ্য তার অধিকার। এটা ন্যায্য হওয়া চাই। যেখানে একজন প্রাইমারি শিক্ষকের বেতন বিশ থেকে পঁচিশ হাজার সেখানে একজন ক্বওমী সিনিয়র শিক্ষকের বেতন ছয় সাত হাজার! এটা শুধু অন্যায্য নয়; বরং অপমানজনক ও বটে।


অনেকে বলতে পারেন,ভালোই তো চলছে।কোনো অভিযোগ তো নেই। সমস্যা ও তো দেখা যায়না।
হ্যাঁ সমস্যা অনেক গভীরে।
ক্বওমী শিক্ষকদের এই আর্থিক কাটামোর কারনে এখনো ক্বওমি শিক্ষা নিম্ন বিত্তের শিক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে। এখানে উচ্চবিত্ত কিংবা উচ্চ মধ্যবিত্তের সন্তানরা আসছে না।কারন একজন অভিভাবক তার সন্তানের শিক্ষার পাশাপাশি তার ইহকালিন জিবন মানের চিন্তা ও করে থাকে। এই চিন্তাটা দোষের কিছু নয়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি উন্নত জীবন ব্যবস্থার ধারনা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় নয়। এই চিন্তাটায় কারো দুর্বল ঈমানের প্রশ্ন তোলা একধরনের গোড়ামি।একজন মানুষ ধার্মিক হলেই তাকে গরিব হতে হবে এই ধারনা মুর্খতা। সুতরাং এই চিন্তা থেকেই ক্বওমী মাদরাসা এখনো গণমানুষের প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বস্তরে সমাদৃত হতে পারেনি।

অপরদিকে এই মানহীন জিবন ব্যবস্হা ক্বওমি মাদরাসাকে মেধাশুন্য করে দিচ্ছে। হিসেব করে দেখুন কয়জন মেধাবি ক্বওমি ছাত্র শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিচ্ছে? বলা যায় খুবই কম সংখ্যক। হয় তারা জেনারেল লাইনে চলে যাচ্ছে,অথবা কিছুদিন খেদমত করে উন্নত জিবন ব্যবস্থার তাগিদে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হাজার হাজার মেধাবি আলেম বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।এরা চাকরির অভাবে নয় বরং সবদিক কুলিয়ে উঠতে না পেরে দেশ ছেড়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে মান সম্পন্ন শিক্ষক শূণ্যতায় ভোগবে ক্বওমী মাদরাসা গুলো।
আমি জামেয়া পটিয়ার অবিসংবাদিত পরিচালক আল্লামা হারুন ইসলামাবাদি রঃ কে বলতে শুনেছি, “ক্বওমি মাদরাসা কখনো অর্থাভাবে বা কারো ষঢ়যন্ত্রে বন্ধ হবেনা,যদি কখনো বন্ধ হয় তাহলে যোগ্য লোকের অভাবেই হবে। ”
আর যোগ্য ও মেধাবিদের ধরে রাখতে হলে অবশ্যই তাদের থাকা,খাবার এবং আর্থিক দিক মান সম্পন্ন করতেই হবে।

একজন ক্বওমী শিক্ষকের নুন্যতম বেতন পনেরো হাজার হওয়া উচিৎ।সিনিয়রদের বিশের উপরে।মনে রাখতে হবে উঁচু দালানের চেয়ে একজন ভালো শিক্ষক ক্বওমী মাদরাসার জন্য বেশী প্রয়োজন।

লেখাটা পড়ে অনেকে খুলুচিয়তের ওয়াজ করবেন।ফুলুসের টানাপোড়েনে খুলুচিয়তের দুর্দশা দেখেছি অনেক।এটা রাসুল সঃ এর হাদিস ও বটে। সুতরাং বাস্তবতার নিরিখে লিল্লাহিয়াত খোঁজাই বুদ্ধিমানের কাজ। সব মিলিয়ে এখনই ভাবার সময়। পৃথিবী এগিয়েছে মানুষের মনস্তাত্বিক জগতের পরিবর্তন হয়েছে। তার সাথে সামঞ্জস্যতা রাখতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে হবে নিশ্চিৎ।

Check Also

রামগঞ্জে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে ১জনকে হত্যা ৩জনকে আহত।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের নান্দিয়া পাড়া গ্রামে মহসিন হোসেন (২৬) নামের একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী …

ড.মুরসি জন্য দোয়ার আয়জন করে জামায়াতে ইসলামী।

ড. মুরসির শাহাদাৎ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে – নূরুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশ …

মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির মৃত্যুতে ছাত্রশিবিরের শোক।

মিশরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একমাত্র প্রেসিডেন্ট, বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ড. মুহাম্মাদ মুরসির ইন্তেকালে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *